গেরিলা ওপেন অ্যাকসেস মুভমেন্ট

তথ্য হল এক ধরনের ক্ষমতা। এবং, অন্যান্য সব ক্ষমতার মত একেও কিছু মানুষ কুক্ষিগত করে রাখতে চায়। যুগ যুগ ধরেই বইপত্র আর জার্নালগুলোতে বিশ্বের তাবৎ বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য লিপিবদ্ধ হয়ে আসছে। সেগুলোর ক্রমবর্ধিত ডিজিটাল সংস্করণও তৈরি হচ্ছে ঠিকই, তবে, সেগুলোকে দুষ্প্রাপ্য করে রেখেছে মুষ্টিমেয় কিছু প্রাইভেট কর্পোরেশন। আপনি পৃথিবীর বিখ্যাত সব বৈজ্ঞানিক কাজের নথিগুলো দেখতে চান? তাহলে আপনাকে Reed Elsevire এর মত প্রকাশনাগুলোর পেছনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হবে।

কিন্তু এমনও মানুষ আছেন যারা এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। গেরিলা ওপেন অ্যাকসেস মুভমেন্ট (Guerrilla Open Access Movement) নামক অকুতোভয় আন্দোলনের প্রস্তাব হল, বিজ্ঞানীরা তাদের কাজের কপিরাইট বুঝে নিয়েই যেন খালাস না হয়ে যান, বরং, তাঁদের কাজ যেন ইন্টারনেটে সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকে এই শর্তের দিকেও মনোযোগী হন। কিন্তু, এই দৃশ্যপট যদি রাতারাতি পাল্টেও যায়, যদি আজই এই আন্দোলন সফল হয়ে যায়, তাহলেও এর ফল কেবলমাত্র ভবিষ্যতের জন্যই প্রযোজ্য হবে। এখন পর্যন্ত যে বিপুল পরিমাণ তথ্য প্রাইভেট কর্পোরেশনগুলোর কব্জায় রয়েছে সেগুলো মুক্ত করার দৃশ্যত আর কোনো বৈধ উপায় নেই।

বড় বেশী মূল্য দিতে হচ্ছে আমাদের। সহকর্মীদের কাজ পড়তেও একাডেমিকদেরকে মূল্য পরিশোধ করতে বাধ্য করা কি কোনো কাজের কথা? লাইব্রেরির বিশাল সংগ্রহ স্ক্যান করে সংরক্ষণ করে কেবল গুগলে জড়িতদের জন্যে তা উন্মুক্ত রাখাই বা কেমন কথা? প্রথম বিশ্বের অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই কেবল বিজ্ঞানের সব গুরুত্বপূর্ণ নথির যোগান থাকবে, অথচ তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বের বিপুল সংখ্যক মানুষকে এই জ্ঞান থেকে বঞ্চিত করা হবে এটাই বা কেমন কথা?

নিঃসন্দেহে এগুলো অত্যন্ত গর্হিত কাজ, এবং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু, আইনকানুন সবই তাদের পক্ষে। এইসব কর্পোরেশনগুলোই কপিরাইটের ধারক-বাহক। আর, জ্ঞানের ব্যবসাই তাদের অর্থের বিরাট উৎস। তাই, অনেকেই এর সমস্যার দিকটা বুঝতে পেরেও থমকে যান। ভাবেন, “আমরা আর কিই বা করতে পারি?”

কিন্তু, আমাদের করার আছে অনেককিছু। ইতিমধ্যে তা করছিও। আমরা রুখে দাঁড়াচ্ছি। যেসকল শিক্ষার্থী, গ্রন্থাগারিক, গবেষক এই বিপুল জ্ঞানের রস আস্বাদনের সুযোগ পেয়েছেন, আপনারা সৌভাগ্যবান। জ্ঞানের যে মহাযজ্ঞ থেকে পুরো পৃথিবী বঞ্চিত, আপনারা সেখানেই আমন্ত্রিত। কিন্তু, এই সুযোগ কেবল নিজের জন্য তুলে রাখলে চলবেনা। তথ্যের ভাণ্ডারে অবাধ বিচরণের এই সুযোগ আপনাদেরকে কাজে লাগাতে হবে। এটা আপনারা করতে পারেন পাসওয়ার্ড আদানপ্রদান করে অথবা, বন্ধুদের জন্য ডাউনলোড করে।

এদিকে, বঞ্চিতরাও কিন্তু বসে নেই। প্রকাশকদের দখলে থাকা তথ্য তারা বিভিন্ন কৌশলে উন্মুক্ত করে দিচ্ছেন এবং ছড়িয়ে দিতে কাজ করে যাচ্ছেন। স্বাভাবিকভাবেই, এসব কাজ চালাতে হয় গোপনে। একে আবার আইনের চোখে ‘পাইরেসি’ বা ‘চুরি’ হিসেবে দেখা হয়। জ্ঞানের বিরাট ভাণ্ডার মুক্ত করার ‘অপরাধ’ যেন মানুষ হত্যার সমান। কিন্তু, খুব সাধারণভাবে চিন্তা করলেই আমরা বুঝতে পারব, এটা অনৈতিক কিছু তো নয়ই, বরং যুগ যুগ ধরে অর্জিত জ্ঞানের সংগ্রহ সকলের সাথে ভাগাভাগি করে নেওয়াটাই একান্ত প্রয়োজনীয়। লোভ আমাদের বোধশক্তি গ্রাস করে না ফেললে এই সত্য সকলেরই বুঝতে পারার কথা।

আর, বড় বড় কর্পোরেশনগুলোর চালিকাশক্তিই হল লোভ। যেসব আইন তাদের স্বার্থসিদ্ধি করে, তাতে এক চুল পরিবর্তন হলেই এইসব কর্পোরেশনের অংশীদারেরা বেজার হবেন। আর, রাষ্ট্রের সব রাজনীতিকেরা তো আছেনই তাদের রক্ষাকর্তা হিসাবে। তাই, তাদের প্রণীত আইনকানুনই এসব কর্পোরেশনগুলোকে তাদের স্বার্থ একতরফাভাবে রক্ষা করার সীমাহীন ক্ষমতা দিয়ে থাকে।

অন্যায্য আইন মানার কোনো অর্থই হয় না। তাই, আইন ভাঙার সময় এসেছে। সময় এসেছে স্পষ্ট করে বলবার যে, মানুষের অর্জিত কোনো জ্ঞানকেই কোনো দানব কর্পোরেশন তাদের পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেনা। জ্ঞান হবে উন্মুক্ত। তাই, পৃথিবীর সমস্ত তথ্যে আমাদের সকলের অবাধ বিচরণ থাকবে, বন্ধুদের সাথে ভাগাভাগি করে নেওয়ার অধিকার থাকবে – সেগুলো যেখানেই সংরক্ষিত থাকুক না কেন। কপিরাইট উত্তীর্ণ তথ্যের আর্কাইভ করতে হবে। সকল গোপন ডেটাবেজ, সকল বৈজ্ঞানিক জার্নাল উন্মুক্ত করতে হবে। গেরিলা ওপেন এক্সেসের জন্য আমাদেরকে লড়তে হবে।

পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য সহযোদ্ধাদের নিয়ে আমরা শুধুমাত্র জ্ঞানের বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে শক্ত একটা বার্তাই পৌঁছে দেব না, আমরা একে অতীতের ভাগাড়ে পাঠিয়ে দেব। আমাদের সঙ্গী হবেন?

 

এরোন সোয়ার্টজ
জুলাই ২০০৮, আরমেয়ো, ইতালি